এসএসসি ২০২৫: গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ফল, পাসের হার ৬৮%
দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ হয়েছে। এ বছর গড় পাসের হার, সর্বোচ্চ গ্রেড জিপিএ-৫ এবং শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যায় বড় ধস দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) আনুষ্ঠানিকভাবে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়।
এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় মোট ১৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩১০ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র ১০ লাখ ৬ হাজার ৫৫৪ জন। পাসের হার ৬৮ দশমিক ০৪ শতাংশ, যা গত বছরের ৮৩ দশমিক ৭৭ শতাংশের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ কম। একইসঙ্গে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন, যা গত বছরের চেয়ে ৩৮ হাজার ৮২৭ জন কম।
কেন ফলাফল খারাপ হলো?
ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মূলত তিনটি কারণেই ফল খারাপ হয়েছে:
-
শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি ছিল কম: এবারের পরীক্ষার্থীরা ২০২০ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল, যাদের শিক্ষা জীবন শুরু হয় কোভিড-১৯ মহামারির মধ্য দিয়ে। করোনার কারণে দীর্ঘ সময় ক্লাস বন্ধ ছিল। এরপরও রাজনৈতিক অস্থিরতায় স্কুল বন্ধ থাকায় নিয়মিত ক্লাস হয়নি।
-
গণিতে কঠিন প্রশ্নপত্র: এবার গণিতসহ কিছু বিষয়ে প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে কঠিন ছিল। ফলে গণিতে পাসের হার সর্বনিম্ন হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা বোর্ডে গণিতে পাসের হার ছিল মাত্র ৭৫.১৪ শতাংশ, যেখানে বাংলায় তা ৯৭ শতাংশ, ইংরেজিতে ৮৮ শতাংশ, এবং আইসিটিতে ৯৮ শতাংশ।
-
উত্তরপত্র মূল্যায়নে কড়াকড়ি: আগের বছরগুলোর তুলনায় এবার উত্তরপত্র মূল্যায়নে কোনো নমনীয়তা ছিল না। ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খন্দোকার এহসানুল কবির বলেন, "আমাদের কোনো টার্গেট ছিল না। শুধু চেয়েছি সঠিকভাবে পরীক্ষা ও মূল্যায়ন সম্পন্ন হোক।"
বোর্ডওয়ারি ফলাফল
-
বরিশাল বোর্ড সবচেয়ে পিছিয়ে, পাসের হার ৫৬.৩৮%
-
রাজশাহী বোর্ড সবচেয়ে এগিয়ে, পাসের হার ৭৭.৬৩%
-
ঢাকা বোর্ড: ৬৭.৫১%
-
কুমিল্লা বোর্ড: ৬৩.৬০%
-
যশোর বোর্ড: ৭৩.৬৯%
-
চট্টগ্রাম বোর্ড: ৭২.০৭%
-
দিনাজপুর বোর্ড: ৬৭.০৩%
-
ময়মনসিংহ বোর্ড: ৫৮.২২%
মেয়ে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে থাকা
মেয়েরা এবারও ছেলেদের তুলনায় ভালো ফল করেছে। মেয়েদের পাসের হার প্রায় ৭১ শতাংশ, ছেলেদের ক্ষেত্রে তা ৬৫ শতাংশের বেশি। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৬ হাজার ৭৮০ জন ছাত্রী এবং ৫৮ হাজার ২৩৮ জন ছাত্র।
শতভাগ পাস ও শূন্য পাস
এবারের পরীক্ষায় ৩০ হাজার ৮৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৯৮৪টি প্রতিষ্ঠান শতভাগ পাসের কৃতিত্ব অর্জন করেছে, যেখানে গত বছর সংখ্যাটি ছিল ২,৯৬৮টি। অন্যদিকে, ১৩৪টি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি; গতবারের তুলনায় যা ৮৩টি বেশি।
জিপিএ-৫ এর প্রবণতা
গত চার বছরে জিপিএ-৫ এর সংখ্যা ছিল নিম্নরূপ:
-
২০২১: ১,৬৩,৮৪০ জন
-
২০২২: ২,৩৫,৪৯০ জন
-
২০২৩: ১,৫৯,২২০ জন
-
২০২৪: ১,৬৩,৮৪৫ জন
-
২০২৫: ১,২৫,০১৮ জন
এ থেকে স্পষ্ট যে, এবছর জিপিএ-৫ এর সংখ্যা সবচেয়ে কম।
শিক্ষাবিদদের মত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, "পাস-ফেল বড় বিষয় নয়, শিক্ষার্থীরা কী দক্ষতা অর্জন করছে তা-ই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি শ্রেণিতে শিক্ষাক্রম অনুযায়ী যথাযথ দক্ষতা অর্জন নিশ্চিত করতে হবে।"
দাখিল ও ভোকেশনাল পরীক্ষার ফল
একই দিনে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন দাখিল এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি ও দাখিল ভোকেশনাল পরীক্ষার ফলও প্রকাশিত হয়েছে। তবে এসব ফলাফল নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। শিক্ষা বোর্ডগুলো পৃথকভাবে ফলাফল প্রকাশ করেছে।
উপসংহার:
২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফলাফলের এই ধস ঠেকাতে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রমভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।